বাংলাদেশ ব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তুহিন রেজার লাগামহীন দুর্নীতি-অনিয়ম

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:৪৪ অপরাহ্ণ, ২২ জুলাই ২০২০

জাহিদ হাসান রনিঃ

বাংলাদেশ ব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে, চাকরিতে যোগদানের জীবন বৃত্তান্তেও বিভ্রান্তি, গ্রামের ধারাভাষ্যকার থেকে এখন সিইও!

নিজস্ব প্রতিবেদক: নানা অনিয়ম আর দুর্নীতিতে জড়িয়ে কোটিপতি এখন ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তুহিন রেজা। বিভিন্ন অদৃশ্য ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানা অভিযোগ থাকার পরও বহাল থাকা তুহিন রেজার আমল নামা এখন বেজায় ভারি।

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড। নানা বিতর্কের মধ্যদিয়ে জন্ম দেয়া এই প্রতিষ্ঠানটি পড়েছে একাধিকবার নানা বিপাকে। নানা অব্যবস্থাপনায় এই প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল অনেক বিদ্যমান। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ কোটি টাকা জরিমানার মুখে এর আগে চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে তার ভাই ফয়সাল আহমেদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যিনি আগে ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান। এরপর বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছে তুহিন রেজা। চাকরিতে যোগদানের শুরুটাই যার হয় দুর্নীতি দিয়ে সেই চাকরিতে কতটা দুর্নীতি আর অনিয়ম হতে পারে তা হয়তো বলেও শেষ করার মত না।

ব্যাপক অনুসন্ধানে বেড় হয়ে আসে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে বর্তমান কর্মরত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ তুহিন রেজার ব্য‍াপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র আর এক অদৃশ্য ক্ষমতার জোড়। সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ১৩ তারিখ ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে নিয়োগ প্রাপ্ত হন তিনি। নিয়োগকালীন সময়ে তুহিন রেজা ব্যক্তিগত সিবিআই (CBI Status) সংক্রান্ত তথ্য গোপন করেন। পরবর্তীতে এইচ আর ডি(HRD) কতৃক তুহিন রেজার ব্যক্তিগত নথিতে সংযোজন করা হলেও পরবর্তীতে ক্ষমতার অপব্যাবহার করে ব্যক্তিগত নথি থেকে সরিয়ে ফেলারও অভিযোগ উঠে তুহিন রেজার বিরুদ্ধে। এ বিষয়টি সম্প‍ূর্ণ অস্বীকার করেন তুহিন রেজা।

তবে এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তুহিন রেজা ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিঃ এর মাণব সম্পদ বিভাগ থেকে ফাইল নিয়ে তার সিবিআই প্রতিবেদন (CBI REPORT) সরিয়ে ফেলেন যা মানব সম্পদ বিভাগের তৎকালীন কর্তব্যরত আজমিরী ইসলাম, মোঃ ইব্রাহীম, এবং আশেক মাহমুদ স্বীকার করেন।

এদিকে চাকরিতে যোগদানের পুর্বে ও পরে পৃথক দুইটি জীবন বিত্তান্তদিয়েছেন তুহিন রেজা যা একটির সাথে অপরটির তথ্যের মিল ছিল না এবং মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করেন। তুহিন রেজার চাকরিতে যোগদানের পর ২৭৬তম পর্ষদ সভায় তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তবে কথায় আছে ‘চোরে না শুনে ধর্মের বানী’। দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই একক স্বাক্ষরে মাত্র ১ মাসে ২৩ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিয়োগ প্রদান করেন। কিন্তু উক্ত নিয়োগের বিষয়ে সার্ভিস রুলস এর ৩.৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিয়ম মেনে সংবাদপত্র এবং অনলাইনে নিয়মানুসারে বিজ্ঞাপন দেয়ার কথা থাকলেও কোথাও কোন বিজ্ঞপ্তি দেননি তুহিন রেজা। পাশাপাশি কোন প্রকার নিয়ম মাফিক সাক্ষাৎকার ব্যতি রেখেই ২৩ জনকে নিয়োগ প্রদান করেছেন।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন যুগ্ম-পরিচালক মোহাম্মদ ইমাম হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তুহিন রেজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ২৭৬ তম পর্ষদ সভায় তুহিন রেজাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চলতি দায়িত্বের স্বীকৃতি দেয়া হলেও কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগের কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।

চিঠিতে আরও বলা হয়, নিয়োগকৃত ২২জন কর্মকর্তা কর্মচারী মধ্যে ২০-১০-২০১৬ তারিখে নিপেন্দ্র চন্দ্র পন্ডিতের অনুকুলে এসইভিপি পদে নিয়োগ ইস্যু করা হয়। তবে নিপেন্দ্র চন্দ্র পন্ডিত পিপলস লিজিংয়ে কর্মকালীন সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িত ছিলেন। ২৭৭তম পর্ষদ সভায় নিপেন্দ্র চন্দ্র পন্ডিত এর নিয়োগ প্রস্তাব উত্থাপিত হলে পিপলস লিজিংয়ে কর্মরত থাকাবস্থায় তার কার্যক্রমসহ ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ছাড়পত্র গ্রহন করেছে কিনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের কাছে দেয়া হয়েছে কিনা এ বিষয়েও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

এছাড়াও ২৭৮তম পর্ষদ সভায় তুহিন রেজা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে মিথ্যাচার করেছে বলেও জানা যায়। এক নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন, সিআইবি অনুসন্ধান এবং ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড থেকে তুহিন রেজার ব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ড এবং অপর দশজন ব্যক্তির ক্রেডিট কার্ডের গ্যারান্টির বিপরীতে মোট ১ কোটি ৪৮ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯০৮ টাকা খেলাপি ছিল। তার এসব ঋণকে ক্ষতিজনক বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, তুহিন রেজা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পালনকালে নিজ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ কর্তৃক ০৬/০৩/২০১৭ তারিখ একটি পরিদর্শন রিপোর্টের ভিত্তিতে একটি অভিযোগনামা দাখিল করা হয় এবং অভিযোগটি প্রমানিত হওয়ায় ২৭/০৪/২০২৭ তারিখ অনুষ্ঠিত ২৮৩ নং পরিচালনা পর্ষদ সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) তুহিন রেজার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কথা চিন্তা করে সেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগ দেয়া হয় এবং তুহিন রেজা ০২/০৫/২০১৭ সেচ্ছার পদত্যাগপত্র প্রদান করলে তা কার্যকর করা হয়।

পরবর্তীতে তিনি রহস্যজনকভাবে পুনরায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে। তুহিন রেজাকে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) দেয়া হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর জারীকৃত সার্কুলার নং ২ এর ১২(গ) এর বিধান মোতাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্বপ্রাপ্তকে কোনভাবেই ৯০ দিনের বেশি রাখা যায় না। এই ৯০ দিনের মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্থলে একজন স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিয়োগ প্রদান করতে বিধান রয়েছে। এদিকে ৯০ দিনের জায়গায় দীর্ঘ ৮ মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোন স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ না দিয়ে নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে চলতি দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

গোপন সূত্রে জানা গেছে, ৯০ দিনের বাধ্যবাধকতা শেষ করে প্রতিষ্ঠানের পর্ষদকে বাধ্য ব্যপস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগের সময় বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পত্র প্রেরনের জন্য। অপরদিকে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তুহিন রেজা তার নিজের নিয়োগ নিশ্চিত করতেই উঠেপরে লেগেছে। এ জন্য তিনি কোন প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেননি। এমনকি পর্ষদ সভায় কোন প্রকার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াও করা হয়নি বলেও জানা গেছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তুহিন রেজা নিজের নামের প্রতিষ্ঠান টিআর ইন্টারন্যাশনাল (T.R.INTERNATIONAL) দাড় করিয়ে তার দাড়া ঋণ অনুমোদন/পাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য প্রেরন করে থাকেন। এছাড়াও নাম সর্বস্বপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে ঋণ পাশ করে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাশ করানোর চেষ্টা চালান তিনি। এদিকে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তার পদ দীর্ঘ ৬ মাসের অধিক সময় যাব‍ৎ শূন্য থাকা স্বত্বেও ব্যক্তি স্বার্থে এই নিয়োগটির প্রকিয়াও সম্পন্ন করেননি তুহিন রেজা।

জানা যায়, ইতি মধ্যে তার অপকর্ম ও দুর্নীতিতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানের অনেকেই। ঢাকায় তুহিন রেজার রয়েছে বেশ কিছু ক্যাডার বাহিনী তাই ওই বাহিনীর নির্যাতনের ভয়ে এবং চাকরি হারানোর ভয়ে কেউই মুখ খুলছে না। ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের বর্তমান চেয়ারম্যান ইসরাফিল আলমের সাথে গোপন সক্ষতা গড়েই তুহিন রেজা এই প্রতিষ্ঠানে চালিয়ে যাচ্ছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। তুহিন রেজার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের কাউখালি থানার বলভদ্রপুর গ্রামে। এক সময়ে এলাকায় তিনি গ্রাম্য খেলাধুলার ধারাভাষ্যকারের ভূমিকা পালন করতেন। এছাড়াও যুক্ত ছিলেন স্থানীয় বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মি হিসেবে। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেও খুব অল্প সময়েই রাতারাতি এলাকায় এখন তার নামে ও বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পত্তি। এছাড়াও তার ব্যাংক এখন অনেক ভারি।

এ বিষয়ে তুহিন রেজাকে ফোন করলে তিনি সাংবাদিক পরিচয়ে পেয়ে ফোন কেটে দেন। তাই তার বক্তব্য জানা যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন :