করোনা বিশ্বকে প্রযুক্তি ও আত্মনির্ভর করে তুলবে

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:৪১ পূর্বাহ্ণ, ১৪ মে ২০২০

অনলাইন ডেস্ক; পৃথিবীর ইতিহাসে চোখ দিলে দেখা যায়, এ ধরনের সংকটকালে অভ্যন্তরীণ নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে সরকারগুলো অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে যায়, যার আরেক অর্থ রক্ষণশীলতার হুমকি। আর্থিক ক্ষতির বিচারে অনেক পিছিয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। এখন সরকারগুলোকে অনেক বেশি করে দেশের জনগণের জন্য চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত নানা উৎকর্ষ ও অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ করার নামে মানুষের ওপর অনেক বেশি নজরদারি বাড়বে। এই নজরদারির প্রবণতা নিজেদের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করবে খুব শিগগির। আর তাতেই ঘটে যাবে বিপত্তি। চরমভাবে লঙ্ঘিত হবে মানবাধিকার, আরও একবার পৃথিবী রক্ষণশীলতার মোড়কে আবৃত হবে। নিশ্চিতভাবেই করোনাকাল বিশ্বব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
করোনা পরিস্থিতিতে থমকে গেছে সমগ্র বিশ্ব। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি থেকে শুরু করে এমন কোনো খাত নেই যা এই করোনাভাইরাসে প্রভাবিত হয়নি। প্রভাবিত নয়, বরং বলা যায় চরম ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্ব যে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার ক্ষত শুকাতে দশককাল লাগতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। কারণ এটি এখন আর মাত্র কয়েক মাসের ট্রমা না। বরং আদৌ এই সংক্রমণ থেকে বিশ্ব মুক্তি পাবে কিনা বা পেলেও এর ধরন কী হবে, তা নিয়ে সংশয়, আলাপ-আলোচনা গবেষণা চলবে বছরের পর বছর।

সংকটময় এই ক্রান্তিকালে একদিকে যেমন বিশ্বজুরে প্রাণহানি ঘটছে, তেমনি মানুষের বেঁচে ওঠার প্রবণতাও লক্ষণীয়। মানব সভ্যতা বারবার প্রকৃতির কাছে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। আবার সেই প্রকৃতিকে পরাজিত করেই মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে। মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও নিরন্তর গবেষণা সৃষ্টির সমুদয় মহাসাগরে মানবজাতিকে সবার উপরে স্থান দিয়েছে। শুধু করোনা সংকটেই নয়, প্রতিটি ক্রান্তিকালে মানুষ সব সময় বিকল্প পথের সন্ধান বের করে নিজেকে অভিযোজিত করে টিকিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ার বুকে অনেক পরিবর্তন একযোগে ঘটে, যা এর আগে কখনো ঘটেনি। বিশ্বব্যাপী আরেকটি পরিবর্তন আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের সময় থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের সময়কাল পর্যন্ত ঘটে এই পরিবর্তনগুলো। এর ধারাবাহিকতায় পূর্ব ইউরোপসহ সারা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসে আমূল পরিবর্তন। সে সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এবং ব্রিটিশ প্রধনামন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার একযোগে সেই পরিবর্তনকে বলেছিলেন নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কালে বিশ্বে এক পক্ষ ছিল অন্য পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী। সমরসজ্জা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সাজানো হতো সেই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে। এবার করোনাযুদ্ধে লিপ্ত সারাবিশ্ব। বিশ্বের প্রতিটি দেশ করোনার কারণে প্রভাবিত হয়েছে। বিশ্বের কমন শত্রম্ন করোনাভাইরাস। আর এর বিরুদ্ধে লড়াইটাও সামগ্রিক। তবে একেক দেশ লড়াই করছে একেক রণকৌশলে। এখানে আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে এর ফলে প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট দেশ অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। কিন্তু কার্যত মাঠের বাস্তবতা হলো, এর ফলে প্রতিটি দেশ নিজেকে রক্ষার জন্য যে নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করবে, তার ফল হবে অত্যন্ত রক্ষণশীল। উদারাবাদের এই যুগে এই রক্ষণশীলতা বিশ্বব্যাপী আবার নতুন করে চেপে বসার আশঙ্কা বয়ে এনেছে করোনা সংকট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি ছিল উপনিবেশিকতানির্ভর। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো উপনিবেশিকতা থেকে অর্জিত অর্থের বিরাট অংশ ব্যয় করে যুদ্ধে। একই সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উপনিবেশিকতার অর্গল ভাঙা শুরু হলে শাসক রাষ্ট্রগুলো বেশ বেকায়দায় পড়ে। তবে ব্যতিক্রম ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভৌগোলিকভাবে যুদ্ধমুক্ত থাকায় দেশটির অর্থনীতি যুদ্ধের সময়কালে বেশ স্ফীত হয়, যার ধারাবাহিকতায় তারা পরবর্তী সময়কালে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রথম পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় দেশটি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সে অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়। কিন্তু সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক সাফল্যে ভাটা পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অর্থনীতির তকমা ধরে রাখা। ক্রমে চীন হয়ে ওঠে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি। এবারের করোনাযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। করোনায় দেশটিতে প্রাণহানি প্রায় এক লাখ। কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা বেসরকারি হিসেবে প্রায় পাঁচ কোটি। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সং্যখ্যা প্রায় বিশ কোটি। ৩২ কোটি মানুষের দেশটিতে করোনা সংক্রমণ তাই প্রতিনিয়ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কত বছর থাকবে তা এই মুহূর্তে নির্ণয় করা ভালো পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞদের পক্ষেও সম্ভব নয়। অন্যদিকে প্রথম করোনা আক্রান্ত দেশ চীনের অর্থনৈতিক ক্ষতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়। ফলে দেশ দুটির মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান আরও বাড়বে। ইউরোপও অবর্ণনীয় ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া রাষ্ট্র গ্রেট ব্রিটেন ইউরোপে সবচেয়ে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। করোনাযুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি অন্য যে কোনো শিবির বা রাষ্ট্রের চেয়েও অনেক বেশি। আর অবধারিতভাবে এর ফলে বিশ্ব রাজনীতি প্রভাবিত হবে।

করোনা সংকটে বিশ্বের রাষ্ট্র বা সরকার ব্যবস্থাগুলো প্রাথমিকভাবে নিজের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে। এর ফলে দেশগুলো নিজেরা না চাইলেও আগের চেয়ে অনেক বেশি রক্ষণশীল হয়ে পড়বে। এর ফলে কার্যত প্রথম হোঁচট খাবে গেস্নাবাল ভিলেজ বা একক বিশ্ব চেতনা। একক ইউরোপের অস্তিত্ব অবশ্য ব্রেক্সিটের মাধ্যমে অনেকটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও করোনা সংকটে অভিবাসন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। করোনার এই সময়ে বিশ্বব্যাপী রক্ষণশীল মানসিকতা আরও বিস্তার লাভ করবে। বিশ্বের দেশে দেশে যোগাযোগের মাত্রা এই সংকটে অনেক কমে গেছে। ভবিষ্যতে আরও কমবে। এর ফলে বিশ্ব নেতাদের খুব শিগগির সরাসরি উপস্থিত হয়ে যে কোনো ধরনের সম্মেলনে অংশ গ্রহণের প্রবণতা কমবে। বাড়বে অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ। এক দেশের মানুষের অন্য দেশে সফরের ক্ষেত্রে আসবে নানা বিধি-নিষেধ। বড় ধরনের সম্মেলন বা বেশি মানুষের উপস্থিতি কমবে আশঙ্কাজনকহারে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ অনেক কমে যাবে। তৈরি হবে দূরত্ব। এই দূরত্ব ক্রমে মানুষের চিন্তায়ও প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে মরিয়া চেষ্টা থেকেও পিছু হটবে না। ফলে যেগাযোগবিহীন এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে বিশ্ব। এর নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। নিশ্চয় এই বিশ্বের বিবেকবান সাধারণ মানুষ বড় ধরনের রক্ষণশীলতা জেঁকে বসার আগেই পরিস্থিতি সামলে নেবে। তবে সব কিছু নির্ভর করে করোনা পরিস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতি কোন দিকে যায় তার ওপর।

করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সবচে বেগ পেতে হবে বড় রাষ্ট্রগুলোকে। বিশ্বের আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটি এমন যে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে যে কোনো দেশের সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরাসরি তার প্রভাব পড়ে। করোনাকালে মানুষের অকাতের প্রাণহানি ছাড়াও ধসে পড়েছে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। গত একশ বছরে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পন্ন এরকম আর্থিক ক্ষতি আর দেখা যায়নি। সরকারগুলোকে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যতটা না বেগ পেতে হবে, তার চেয়েও অনেক বেশি বেগ পেতে হবে অভ্যন্তরীণভাবে উত্থাপিত নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে। ধনী-গরিব সব দেশে প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে। ধনী দেশগুলোর তো সম্পদের অভাব নেই, তাহলে এত মানুষের প্রাণহানি কেন? নিশ্চিতভাবেই উত্তর আসবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পর্যাপ্ত সুরক্ষিত ছিল না, জনসংখ্যার অনুপাতে ভেন্টিলেটরের মতো ব্যবস্থাও ছিল অপ্রতুল। সব মিলিয়ে করোনাকালে উত্তর একটাই আসবে, মানুষের বসবাসের এই গ্রহে মানুষের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ইতিহাসের দিকে চোখ দিলে দেখা যায়, এ ধরনের সংকটকালে অভ্যন্তরীণ নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে সরকারগুলো অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে যায়, যার আরেক অর্থ রক্ষণশীলতার হুমকি। নিশ্চিতভাবেই করোনাকাল বিশ্বব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। আর্থিক ক্ষতির বিচারে অনেক পিছিয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। এখন সরকারগুলোকে অনেক বেশি করে দেশের জনগণের জন্য চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত নানা উৎকর্ষ ও অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ করার নামে মানুষের ওপর অনেক বেশি নজরদারি বাড়বে। এই নজরদারির প্রবণতা নিজেদের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করবে খুব শিগগির। আর তাতেই ঘটে যাবে বিপত্তি। চরমভাবে লঙ্ঘিত হবে মানবাধিকার, আরও একবার পৃথিবী রক্ষণশীলতার মোড়কে আবৃত হবে।

আপনার মতামত লিখুন :