কিংবদন্তি প্রকৌশলী জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী- এম. এ. আলিম খান

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:০৬ অপরাহ্ণ, ২৮ এপ্রিল ২০২০

এম. এ. আলিম খান: বাংলাদেশের প্রযুক্তির আকাশে উজ্জ্ব¡ল নক্ষত্র, কিংবদন্তি প্রকৌশলী, স্থপতি, গবেষক ও শিক্ষাবিদ জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার ভোর রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর কর্মময় জীবনের উপর সামান্য আলোকপাত করছি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বহু তরুণ প্রকৌশলী ও ডাক্তার উন্নত জীবনের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ফিরে এসেছেন দেশমাতৃকাকে ভালবেসে দেশের সেবা করার জন্য, দেশের ঋণ শোধ করার জন্য। স্বাধীনতা পরবর্তী যত বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে তার প্রত্যেকটির সাথে রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা।

বাংলাদেশ সরকারও এই দেশপ্রেমিক মানুষটিকে তাঁর যোগ্য সম্মান দিয়েছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১৭ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার ৫ বছরের জন্য তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। দেশের কীর্তিমান মানুষ অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর অবিভক্ত আসামের সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবিদ রেজা চৌধুরী এবং মা হায়াতুনন্নেছা চৌধুরী দম্পতির ৩ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে ৩য় সন্তান জামিলুর রেজা চৌধুরী। ছোট বেলায় পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে পরিচিত ছিলেন প্রকৌশলী বাড়ির ছেলে হিসেবে। কারণ তাঁর বাবা ও ভাইসহ একই পরিবারে ছিল ১২-১৩ জন প্রকৌশলী। মাত্র তিন বছর বয়সে সিলেট ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে চলে যান আসামের জোড়হাটে। ১৯৪৭ সালে আবার ফিরে আসেন সিলেটে এবং চাকরির সুবাদে তাঁর বাবা বদলি হয়ে চলে যান ময়মনসিংহে।

১৯৪৯ সালে ময়মনসিংহের নামকরা কিন্ডারগার্টেন স্কুল আওয়ার লেডি ফাতেমাতে তাঁর বাবা তাকে ভর্তি করে দেন। কিন্তু এই স্কুলে দুই দিন যাওয়ার পর তিনি আর যাননি। ১৯৫০ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ক্লাস ফোরে ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে বাবা বদলি হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। তখনকার দিনে ঢাকার নামকরা স্কুল সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তির জন্য বাবা নিয়ে গেলেন। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানালেন ক্লাস সিক্সে ভর্তি হওয়া যাবে না কারণ কোন সিট খালি নেই শুধু ক্লাস সেভেনে একটি সিট খালি আছে। তাঁর বড় ভাইকে সেভেনে ভর্তি করানো হলো আর তাঁকে প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল) এসে ভর্তি হলেন। পরের বছর ১৯৫৩ সালে গ্রেগরিজ স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হন এবং ঐ স্কুল থেকে ১৯৫৭ ম্যাট্রিক পাশ করেন। ম্যাট্রিক পাশের পর ভর্তি হন ঢাকা কলেজে এবং ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।

ছোট বেলায় হ্যাট পরে রাজকীয় আসনে ট্রলিতে বসার লোভে রেলে চাকরী অথবা আইসক্রীম খাওয়ার লোভে আইসক্রীম ফ্যাক্টরীতে চাকরি নিতে চাইলেও তা ছিল ক্ষণিকের মোহ। কিছু দিন পরেই তা ভুলে গিয়েছিলেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রকৌশলী হবার ইচ্ছা নিয়ে ভর্তি হন তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যা বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট। ১৯৬৩ সালে পুরকৌশল বিভাগ থেকে সম্মানসহ ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান অধিকার করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ২০ বছরে জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে পুরকৌশল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে বুয়েট থেকে শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথম অনার্সসহ ফাস্ট ক্লাস পেয়েছিল আর ২য় শিক্ষার্থী হিসেবে ১৯৬৩ সালে পেয়েছেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। ২৮ অক্টোবর ১৯৬৩ থেকে বুয়েটে তাঁর শিক্ষাকতা জীবন শুরু হয়।

১৯৬৪ সালে বার্মাশেল বৃত্তি নিয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। এই বৃত্তি বছরে একটাই দেয়া হতো। পৃথিবী বিখ্যাত ইংল্যান্ডের সাউদাম্পাটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএসসি করেন অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। থিসিসের বিষয় ছিল ‘কংক্রিট বিমে ফাটল’। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে তিনি পিএইচডি করেন। থিসিসের বিষয় ছিল ‘কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিং।’ পরিচিত হন পৃথিবীর প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারের সাথে। জীবনে প্রথম কম্পিউটার দেখেন এবং সেখান থেকে হাতে খড়ি শুরু হয়।

বিশ শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার আসে। ১৯৬৮ সালে বুয়েটে প্রথম কম্পিউটার শিক্ষা শুরু হয়। যারা বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী উঁচু দালান, কলকারখানা, ট্রন্সমিশন টাওয়ার, এয়ারক্রাফ্ট হ্যাঙ্গার, স্টেডিয়াম, জেটি নির্মাণ বা সারা দেশে কম্পিউটার প্রযুক্তি বিকাশে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এসবের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি আর বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর ফেলো জামিলুর রেজা চৌধুরী। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য পেয়েছেন ২০১৭ সালে একুশে পদক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার বিশাল পরিচিতি। ১৯৮৯ সালে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী মাগ্রারেট থ্যাচার, ২০০১ সালে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এবং ১৯৯৮ সালে বিল গেটস্ এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।

২০০১ সালে বুয়েটের বর্ণাঢ্য অধ্যাপনা জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অবকাঠামো উন্নয়ন গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে এবং সম্মিলন সংক্রান্ত প্রকাশনায় এযাবৎ তার ৬৬টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চট্রগ্রাম বিআইটির গভনিং বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান, ইঞ্জিনিয়ার ইনস্ট্রি্িটউশন যুক্তরাজ্যের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ইনস্ট্রি্িটউশনের ফেলো, যুক্তরাজ্যেও একজন চার্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির ফেলো, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্ট্রি্িটউশনের সভাপতি, বাংলাদেশ আর্টকোয়েক সোসাইটির সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সভাপতি, বাণিজ্য মন্তণালয়ের অধীনে সফট্ওয়ার ও আইটি সার্ভিস রপ্তানি সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান, বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার কর্মসূচীর টিম লিডার, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণে এদেশীয় বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি টাস্কফোর্সের সদস্য, আমাদের বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি জড়িত আছেন অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে।

দেশের ক্রান্তিকালে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ইঞ্জিনিয়ারিং এ অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারির্ং ইনস্ট্রি্িটউশন কর্তৃক স্বর্ণ পদক (১৯৯৮), গবেষণা এবং শিক্ষায় অবদান রাখার জন্য বুয়েট থেকে পান ড. রশিদ স্বর্ণ পদক (১৯৯৭), শিক্ষা, বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদানের জন্য রোটারির সীড এ্যাওয়ার্ড (২০০০), লায়নস ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে অবদান রাখার জন্য স্বর্ণ পদক (১৯৯৯), বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি স্বর্ণপদক (২০০৫), শেলটেক পুরস্কার (২০১১), কাজী আজহার আলী স্বর্ণপদক (২০১১), ডাঃ ইব্রাহিম মোমোরিয়াল স্বর্ণপদক (২০১২), জাইকা (জাপান) প্রেসিডেন্ট পদক (২০১৩) সহ আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী প্রদান করে তাকে বিরল সম্মানে ভূষিত করেছে।

শিক্ষকতা পেশাকে তিনি খুবই পছন্দ করেন। বাংলাদেশে শিক্ষার উন্নয়নে তাঁর অবদান অসামান্য। শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা করতে হলে শিক্ষকদের সব সময় পড়াশশুনা করতে হয়। শিক্ষকদের আরেকটা দায়িত্ব কিভাবে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান অর্জন করা।’ বুয়েটের শিক্ষাকে তিনি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করেছেন। ২০১৮ সালে রোমানিয়ায় অনুষ্ঠেয় ৫৯তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ স্বর্ণপদক জয় করে। বাংলাদেশকে নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী এই কিংবদন্তি প্রকৌশলী, স্থপতি, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। তিনি ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী নোবেল প্রাইজ পাবেন।

দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর অবদান অসামান্য। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংঙ্গালী জাতি থাকবে ততদিন তাঁর কর্মের মাঝে এক জলজলে তারকা হয়ে থাকবেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী

আপনার মতামত লিখুন :