অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধিতে “অবাক” সেন্ট্রাল ফার্মার কর্তারাই

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ, ০২ মার্চ ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিষ্ঠানটির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধিতে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরাই অবাক হচ্ছেন। তারা বলছেন, কোম্পানির উৎপাদন এখন বন্ধ, তারপরেও কেন এভাবে দাম বাড়ছে তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

সেন্ট্রাল ফার্মার শেয়ার বিভাগের প্রধান কামাল আহমেদ শনিবার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আমরাও অবাক হচ্ছি কেন আমাদের প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বাড়ছে। দাম বাড়ার মতো ভালো কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।”

কোনো গোষ্ঠী কারসাজি করে তাদের কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়াতে পারে বলে দাবি করছেন তিনি।

গত সপ্তাহ বেশ খারাপ পার করেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। সপ্তাহের পাঁচ দিনের লেনদেনে পাঁচ দিনই সূচক পড়েছে, শেষ দিন বৃহস্পতিবার প্রধান বাজার ঢাকা স্টক একচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬৯ পয়েন্ট বা দেড় শতাংশ কমেছে।

সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে ডিএসইএক্স পড়েছে ২৫০ পয়েন্টের মতো। সপ্তাহজুড়েই কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর।

কিন্তু বন্ধ কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের দর গত সপ্তাহে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। গত তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির দর বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

ঢাকা স্টক একচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, গত বছরের ৪ নভেম্বর সেন্ট্রাল ফার্মা ৩০ জুন ২০১৯ বছরের জন্য মাত্র ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে।

তারপর থেকেই ঔষধ ও রসায়ন খাতের এই কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়তে শুরু করে। ৪ নভেম্বর সেন্ট্রাল ফার্মার শেয়ারের দর ছিল ৭ টাকা ৭০ পয়সা, সেখানে গত বৃহস্পতিবার দর ছিল ১৩ টাকা ৮০ ফয়সা।

সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়া সেন্ট্রাল ফার্মার এই দর বৃদ্ধিকে “অস্বাভাবিক” হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষক ডিএসই”র পরিচালক শাকিল রিজভী। কারসাজির গন্ধও পাচ্ছেন তিনি। শেয়ারটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন ডিএসই“র এই সাবেক সভাপতি।

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্যের জন্য শনিবার সন্ধ্যায় সেন্ট্রাল ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনসুর আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

পরে এসএমএস পাঠালে সেন্ট্রাল ফার্মার শেয়ার বিভাগের প্রধান কামাল আহমেদ ফোন করে এ বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “গত কয়েক দিন ধরে আমাদের কাছে বার বার ফোন আসছে। বাজারে গুজব আছে যে, সেন্ট্রাল ফার্মা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের কোনো তথ্য নেই আমাদের কাছে। থাকলে তো আমরা জানাতামই।

“কারসাজি করে কোনো গোষ্ঠী সেন্ট্রাল ফার্মার শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”

সেন্ট্রাল ফার্মার কয়েকটি ওষুধের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকায় তা পরিবর্তনের নির্দেশ দেয় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সেই কাজের জন্য গত ডিসেম্বর থেকে পুরো কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে কোম্পানির কর্মকর্তা কামাল আহমেদ জানান।

“ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে ছাড়পত্র পেলে আমরা উৎপাদন শুরু করব,“ বলেন তিনি।

ঢাকার পুঁজিবাজারে “বি” ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মা। গত এক বছরে শেয়ারটির সর্বনিম্ন মূল্য ছিল ৬ টাকা ৬০ পয়সা, সর্বোচ্চ মূল্য হয়েছে ১৬ টাকা ৩০ পয়সা।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সেন্ট্রাল ফার্মা নিয়ে কারসাজি হয়ে থাকতে পারে। বাজার খারাপ; সব কোম্পানির শেয়ারের দর যখন কমছে তখন এর দাম বাড়া সবাইকে অবাক করে দিচ্ছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।”

তবে শেয়ারটির দাম বাড়ার অন্য কারণও থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তার ব্যাখ্যা দিয়ে শাকিল রিজভী বলেন, “বেশ কিছু দিন পুঁজিবাজার বেশ খারাপ অবস্থায় ছিল। সে অবস্থায় শেয়ারটির দাম অনেক কমে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাজার ভালো হতে শুরু করায় হয়ত দাম বেড়েছে।”

“বর্তমানে কোম্পানিটির বাজার মূল্য ১৫০ কোটি টাকার মতো। যখন শেয়ারের দাম ৮ থেকে ৯ টাকা ছিল, তখন পুরো কোম্পানির বাজার মূল্য ছিল ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা।”

“তখন কোনো কোনো বিনিয়োগকারী হয়ত চিন্তা করেছে, একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি দিতে অনেক টাকা লাগে। ৮ থেকে ৯ টাকা দামে শেয়ার কিনে যদি একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মালিক হওয়া যায়! সে অবস্থায় তারা প্রচুর শেয়ার কেনা শুরু করতে পারে। কেনার চাপে চাহিদা বাড়ায় দাম বাড়াতে পারে,” বলেন এই বিশ্লেষক।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পিই ৬২ দশমিক ৭৩, এটা কি ভালো না খারাপ, অর্থাৎ এ অবস্থায় কোম্পানিটির শেয়ার কেনা ঠিক কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে শাকিল রিজভী বলেন, “কোম্পনিটির পিই ভালো না। কিন্তু এমন কোনো খবর থাকতে পারে যার ফলে ভবিষ্যতের মুনাফা বাড়তে পারে। তখন পিই ঠিক হয়ে যাবে। আবার সব ক্ষেত্রে পিই কাজ করে না; দেখতে হবে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য কত।

“শেয়ারের বাজার মূল্য যদি শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য থেকে কম হয় তাহলে অনেকে শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্যকে ধরে শেয়ারটি কিনতে পারে।”

সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ফার্মার সম্পদ মূল্য ১৬ টাকা ১ পয়সা।

বৃহস্পতিবার শেয়ারটির সমাপনী মূল্য ছিল ১৩ টাকা ৮০ পয়সা।

“তবে এই সম্পদ মূল্য সঠিক কি না -সেটা নির্ভর করে কোন অডিট ফার্ম আর্থিক প্রতিবেদনটি নিরীক্ষা করেছে। আমাদের দেখতে হবে আমরা সেই নিরীক্ষককে বিশ্বাস করতে পারি কি না?”

তবে পুঁজিবাজারে একটা “ভালো” কোম্পানির যে বিষয়গুলো থাকা দরকার সেটা খুঁজে পাওয়া যায়নি কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানিটির মুনাফা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে ১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল সেন্ট্রাল ফার্মা। ২০১৯ সালে তা তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসে ঠেকেছে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকায়।

২০১৫ সালে কোম্পানিটি ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। ২০১৬ সালে ১০ শতাংশ। ২০১৮ সালে দেয় ৫ শতাংশ।

২০১৯ সালে কোম্পানিটি বোনাস শেয়ার না দিয়ে মাত্র ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের জন্য মাত্র ১০ পয়সা করে পেয়েছেন শেয়ারহোল্ডাররা।

সেন্ট্রাল ফার্মার মোট শেয়ারের সংখ্যা ১১ কোটি ৯৮ লাখ ৮৪৪টি। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা পরিচালকের কাছে আছে ২৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে আছে ৫৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার।

১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। প্রায় ৩৩ বছর পর ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।

পুঁজিবাজার থেকে ১৪ কোটি টাকা তোলে সেন্ট্রাল ফার্মা।

৩০ জুন ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে সেন্ট্রাল ফার্মার নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি বেশ কিছু তথ্য দিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। ওই প্রতিবেদন ডিএসই”র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিটির তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ কোম্পানির ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার কর বকেয়া আছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি নগদে লেনদেন করছে।

নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭-২০০৮ থেকে ২০১৬-২০১৭ সাল পর্যন্ত সেন্ট্রাল ফার্মার কাছে ৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা কর দাবি করেছে এনবিআর। এ বিষয়টিরও কোনো সুরহা হয়নি।

নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান আরও বলেছে, সেন্ট্রাল ফার্মা যে মজুদ পণ্যের কথা বলেছে, তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি কোম্পানিটি।

“যে হারে পণ্য কেনা হয়েছে এবং বিক্রি করা হয়েছে-তা এই মজুদের সাথে মেলে না। এমনকি হিসাব বইয়ে যে মজুদের কথা বলা হয়েছে তার সাথেও বাস্তবে কোনো মিল পাওয়া যায়নি।”

“কোম্পানিটি যে পাওনা দেখিয়েছে, তার আসল অবস্থা বোঝার কোনো উপায় নেই।

আপনার মতামত লিখুন :