দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ নিয়ে বিপাকে ব্যাংক খাত

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:০০ পূর্বাহ্ণ, ২২ নভেম্বর ২০১৯

অনলাইন ডেস্ক; 

দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ (স্ট্রেসড অ্যাসেট) নিয়ে বিপাকে পড়েছে দেশের ব্যাংক খাত। কয়েক বছর ধরে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের বেশির ভাগই খেলাপি হচ্ছে। ঋণ আদায় কমে যাচ্ছে।

ফলে ব্যাংকগুলোতে ড়েঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে- যা ব্যাংক খাতকে দুর্বল করে তুলছে। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ কম দেখানোর পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ঋণ অবলোপন ও পুনঃতফসিলের পথে হাঁটছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় অংকের ঋণ পুনর্গঠন। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে দিন দিন নাজুক হয়ে যাচ্ছে খাতটি।

খেলাপি ঋণ, অবলোপন, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনকে একসঙ্গে ‘স্ট্রেসড অ্যাসেট বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’ বলে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। সূত্রমতে, বর্তমানে এর পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এ নিয়ে চিন্তিত ব্যাংকাররা। এ অবস্থা থেকে ব্যাংক খাতকে উদ্ধারে ভারতীয় মডেল পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে বৃহস্পতিবার বিকালে এমনি একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পিডব্লিউসি বাংলাদেশ নামের একটি সংস্থা সেখানে ‘প্রেজেন্টেশন অন দ্য রিসলিউশন অব স্ট্রেসড অ্যাসেটস ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে নিবন্ধ উপস্থাপন করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ৩০ কর্মকর্তা। এদের মধ্যে ছিলেন ডেপুটি গভর্নর, উপদেষ্টা, নির্বাহী পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের কবল থেকে বেরিয়ে এসেছে তা তুলে ধরা হয় ওই নিবন্ধে। বলা হয়, ঋণ আদায়ের জন্য দেউলিয়া আইন কার্যকর করেছে দেশটির সরকার। এর মাধ্যমে যে কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে টাকা আদায় করা হয়।

প্রয়োজনে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করেছে। আর এর জন্য গঠন করা হয়েছে আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ওই সংস্থাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। ফলে দুদর্শাগ্রস্ত ঋণ দ্রুত আদায় করা গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যে পদ্ধতিতে ভারতে খেলাপি ঋণ আদায় করা হয়েছে- তা বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী করা যায় সেটা পরে ঠিক করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে এ বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। তবে আইএমএফের হিসাবে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আবার চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা।

এর সঙ্গে গত সাড়ে ৬ বছরের ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা পুনঃতফসিল ও ঋণ পুনর্গঠনের ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে সামান্য কিছু আদায় হয়েছে।

সূত্রমতে, সম্ভাব্য খেলাপি হওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং খেলাপি হওয়ার পর তা নিয়মিত করতে পুনঃতফসিল করেন ঋণগ্রহীতারা। পুনঃতফসিল করতে নির্ধারিত হারে নগদ ডাউন পেমেন্ট দেয়ার নিয়ম রয়েছে।

২০১২ সালে ঋণ পুনঃতফসিলের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করা হয়। তবে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিবেচনায় শিথিল শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের ব্যাপক সুযোগ করে দেয়া হয়। এরপরই ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলের গতি বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। কিন্তু পরে আবার সেগুলো খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ৬ বছরে (২০১৩-এর জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত) ব্যাংক খাতে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই (জানুয়ারি-জুন) ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

এর আগে ২০১৮ সালে ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে ১২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং ২০১৩ সালে ১৮ হাজার ২০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল। এছাড়া ২০১৫ সালে বিশেষ বিবেচনায় পুনর্গঠন করা হয়েছিল ১১টি শিল্প গ্রুপের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

আপনার মতামত লিখুন :