জঙ্গিদের নয়া টার্গেট এসব পুলিশ বক্স!

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:১১ অপরাহ্ণ, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

জাহিদ হাসানঃ

মিরপুর ১০ নম্বর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উল্টো পাশের রাস্তার পাশ ঘেঁষে ট্রাফিক পুলিশ বক্স। টিন আর কাচের জানালায় ঘেরা বক্সের ভেতরে দু’তিনজনের বেশি বসার জায়গাও নেই। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, ট্রাফিক পুলিশের দুই কনস্টেবল সেখানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। দু’জনের নামই আশরাফুল ইসলাম। প্রচণ্ড গরমেও তাদের মাথার ওপরে নেই কোনো ফ্যান। তবে টেবিলের ওপর ছোট্ট একটি ফ্যান কোনো রকম ঘুরছিল। বক্সের ভেতরে পানি খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। বসার টেবিল জরাজীর্ণ। এই হলো একটি পুলিশ বক্সের ভেতরের দৃশ্য।

ট্রাফিক বক্সের বাইরের চিত্র আরও করুণ। পাশেই ময়লার বস্তা রাখা। পেছনে খোলা ড্রেন। সেখানে মশার নিরাপদ আবাস। বক্সের নিরাপত্তায় নেই কোনো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও (সিসিটিভি)। কার্যত ভেতর-বাইরে অরক্ষিত পুলিশ ট্রাফিক বক্স। শুধু মিরপুরের ওই বক্স নয়, সরেজমিন দেখা গেল, রাজধানীর সব এলাকায় অধিকাংশ ট্রাফিক বক্সের একই দশা। যেন দেখার কেউ নেই।

গত পাঁচ মাসে ঢাকার পাঁচটি ট্রাফিক বক্স লক্ষ্য করে বোমা হামলা করে জঙ্গি ও দুর্বৃত্তরা। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ট্রাফিক বক্সের পাশে রেখে যাওয়া বোমা বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে মন্ত্রীর প্রটোকলে থাকা এক এএসআইসহ দুই পুলিশ সদস্যকে আহত করে জঙ্গিরা।

ধারণা করা হচ্ছে, এসব ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিরা জড়িত। কেন বারবার টার্গেট হচ্ছে পুলিশ। আর পুলিশকে টার্গেট করতে ট্রাফিক বক্সকে কেন বেছে নেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, অরক্ষিত বলেই নিশানা করা হচ্ছে ট্রাফিক বক্স। আর বক্সে থাকা ট্রাফিক কনস্টেবলদের কারও হাতে অস্ত্র থাকে না। বারবার ট্রাফিক বক্সের পাশে বোমা পাওয়ার ঘটনার প্রেক্ষাপটে ট্রাফিক বক্স ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আতঙ্ক।

পপুলার হাসপাতালের উল্টো পাশে ট্রাফিক বক্সে কনস্টেবল আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মাস দুয়েক আগে ওই বক্সের একমাত্র সিলিং ফ্যানটি কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। এরপর তারা একটি টেবিল ফ্যান কিনেছেন। ট্রাফিক বক্সের দরজা-জানালা সুরক্ষিত না হওয়ায় রাতে যাওয়ার সময় ছোট্ট টেবিল ফ্যানটি পাশের বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীর কাছে রেখে যান তারা।

ট্রাফিকের আরেক কনস্টেবল জানালেন, একের পর এক বক্সে বোমা হামলার ঘটনায় তারাও শঙ্কিত। ট্রাফিক বক্সগুলো ইটের কাঠামো হলে ভেতরে কিছুটা হলেও সুরক্ষা পাওয়া যেত। আর প্রতিটি বক্সের সামনে অন্তত একটি সিসিটিভি থাকলে দুর্বৃত্তরা বোমা বা বোমা জাতীয় কিছু ফেলে যেতেও ভয় পেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডিউটি করার পর বক্সে গিয়ে একটু পানি খাবেন সেই ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি। ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা রাখার অনুরোধ করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজধানীতে ট্রাফিকের চারটি বিভাগের কয়েকশ’ ট্রাফিক বক্স রয়েছে। এর অধিকাংশ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি তৈরি করে দিয়েছে। অল্পসংখ্যক বক্স তৈরি করেছে সিটি করপোরেশন। বেসরকারি উদ্যোগে টিনের ছোট্ট কাঠামোভিত্তিক যে বক্স তৈরি করা হয় তা নিরাপদও নয়। এমনকি যত্রতত্র নির্মাণ করা হয়েছে এসব বক্স।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ট্রাফিক বক্সগুলো আরও নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর ওপর নজর আছে।

ট্রাফিকের উত্তর বিভাগের ডিসি প্রবীর কুমার রায় বলেন, পরপর কয়েকটি বোমা বিস্ম্ফোরণের ঘটনায় ট্রাফিক বক্স ঘিরে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশপাশ এলাকায় কেউ কিছু ফেলে গেল কি-না সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। তবে প্রত্যেকটি বক্সে একটি সিসিটিভি লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ট্রাফিকের পশ্চিম বিভাগের ডিসি জসীম উদ্দিন বলেন, ট্রাফিক বক্স ঘিরে কী কী সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিরপুর ২ নম্বরে পোস্ট অফিসের পাশ ঘেঁষেই রয়েছে আরেকটি ট্রাফিক বক্স। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে একটি ভাঙা পানির ফিল্টার পড়ে আছে। ফুটপাতের ওপর তৈরি ওই বক্সের আশপাশ এলাকায় বসেছে অনেক দোকানপাট। কে ট্রাফিক বক্সের পাশে আসছেন তার দিকে খেয়াল রাখার সুযোগ নেই। প্রায় একই দশা মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়াম ও ফার্মগেট এলাকার ট্রাফিক বক্সের।

দুপুর সোয়া ১টায় কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ বক্সে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক বিভাজনের ওপর স্থাপিত বক্সের দরজা খোলা। ভেতরে টেবিলের ওপর একটি হেলমেট রয়েছে। বক্সের পেছনের অংশে আগাছায় ভরা। দীর্ঘদিন ধরে পরিস্কার করা হয়নি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটি পুরোপুরি অরক্ষিত। সিসি ক্যামেরা তো দূরের কথা, নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। কিছুক্ষণ অবস্থান করে দেখা গেল, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত। মিনিট পাঁচ পর দায়িত্বরত সার্জেন্ট আশিকুজ্জামান মল্লিক এলেন বক্সের সামনে। তিনি জানালেন, এই ক্রসিংয়ে দু’জন কনস্টেবল ও একজন সার্জেন্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করেন। সড়কের ওপরে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকতে হয় সবসময়। বক্সে আসার সুযোগ হয় না বললেই চলে। বক্সের মধ্যে প্রচণ্ড গরম। তিনি নতুন এসেছেন এই ক্রসিংয়ে। বক্সে কোনো ফ্যান পাননি। বিদ্যুৎ লাইনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তিনি শুনেছেন, আগে ফ্যান ছিল। তবে সেটি চুরি হয়ে গেছে। বক্সে তেমন নিরাপত্তা নেই জানিয়ে বলেন, রাস্তায় কাজ করলে ঝুঁকি তো থাকবেই। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হবে।

কমলাপুর ট্রাফিক পুলিশ বক্সটিও ফুটপাতের ওপর। হালকা পাতের তৈরি ছোট্ট একটি ঘর। টিনের জানালা-দরজা। জানালায় কোনো গ্রিল নেই। বক্সের সামনে সড়কের পাশে স্যুয়ারেজের কাজ চলছে, চারদিকে খোঁড়াখুঁড়ি। ঢালাইয়ের বড় পাইপ পড়ে রয়েছে সেখানে। অপরিচ্ছন্ন চারদিক। ফুটপাত হওয়ায় পুলিশ বক্স ঘেঁষে পথচারীদের আনাগোনা। দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে সেখানে দেখা গেল, একজন সার্জেন্ট বক্সের মধ্যে বসে গাড়ির মামলাসংক্রান্ত কাজ করছেন। গায়ে হলুদ জ্যাকেট থাকায় নেমপ্লেটটি ঢাকা পড়েছে। নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। তিনি বলেন, রাস্তায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যস্ত থাকায় বক্সে খুব কম বসা হয়। তাছাড়া বক্সে বিশ্রামের তেমন ব্যবস্থাও নেই। খাবার পানি পর্যন্ত নেই।

বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বাংলামটরের ট্রাফিক পুলিশ বক্সে গিয়ে দেখা গেল, একজন ট্রাফিক কনস্টেবল বসে আছেন। তার নাম লোকমান। তিনি জানালেন, দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করার পর একটু বিশ্রামের জন্য বক্সে বসেছেন। ২-৫ মিনিট পর ফের রাস্তায় নামতে হবে তাকে। তিনি জানালেন, বক্স প্রায় সময়ই ফাঁকা থাকে, কারণ দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যরা রাস্তায় থাকেন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে। বক্সের পাশ দিয়ে মানুষের চলাচল আছে বলেও জানান তিনি। সম্প্রতি রাজধানীতে বেশ কয়েকটি পুলিশ বক্সের সামনে বোমা বিস্ম্ফোরণ ও তাজা বোমা উদ্ধারের ঘটনার পর আতঙ্কিত কি-না জানতে চাইলে দায়িত্বরত সার্জেন্ট মাসুম কায়সার বলেন, আশঙ্কার মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। বক্সে তো সবসময় বসে থাকা যায় না। বক্সের নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবা দরকার।

বাংলামটরের আগে দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে মালিবাগ রেলগেট সংলগ্ন ট্রাফিক পুলিশ বক্সে দেখা গেল, কয়েকজন নারী-পুরুষ বাসের অপেক্ষায় বক্সের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রাফিক পুলিশ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত। বক্সের মধ্যে কেউ নেই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এএসআই রমেশ চন্দ্র বৈদ্যর সঙ্গে কথা হয়। সম্প্রতি পুলিশ বক্সের সামনে বোমা বিস্ম্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের পর কোনো ধরনের আতঙ্কিত কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আতঙ্ক তো আছেই। এই বক্স তো আরও অনিরাপদ। কারণ, বক্সের ওপরে ফ্লাইওভার। ওপর থেকেই অপরাধীরা সুযোগ নিতে পারে।

ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জয়দেব চৌধুরী বলেন, ট্রাফিক পুলিশের কাজই রাস্তায়। কাজ করতেই হবে। তবে আমরা সতর্ক থাকছি। কিছু কিছু মোড়ে সিসি ক্যামেরা আছে। এখন ট্রাফিক পুলিশ বক্সে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ট্রাফিক দক্ষিণের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মেহেদী হাসান বলেন, দক্ষিণ বিভাগ ৫০টির মতো ট্রাফিক পুলিশ বক্স রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই সিটি করপোরেশনের তৈরি। কিছু আছে বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি করা। এগুলোও সিটি করপোরেশন পর্যায়ক্রমে তৈরি করে দেবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বক্সগুলোতে ওয়াসার পানির লাইন এবং টয়লেট থাকা দরকার। কিন্তু ধানমণ্ডির রাসেল স্কয়ারের ট্রাফিক বক্স ছাড়া একটিতেও এ ব্যবস্থা করা হয়নি। টয়লেট না থাকায় নারী সার্জেন্টদের বেশি সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :